সোমবার, ২২ জুলাই, ২০১৩

প্রাচীর: কারাগারের ভয় আমার নেই কিন্তু কবরে যাবার ইচ্ছাও আমার নেই

পুরান ঢাকায় কেন্দ্রীয় কারাগারের দেয়াল ঘেঁষে বহুবার চলে গিয়েছি। কখনও বা চক বাজারের ঐতিহ্যবাহী জ্যামে আটকে থেকেছি আর উঁচু প্রাচীরের অন্যপাশের মানুষগুলোর জীবন নিয়ে কৌতুহল দেখিয়েছি। কিন্তু যখন আমি নিজে ঐ ভুবনের বাসিন্দা হয়েছি তখন সত্যিকারভাবে উপলব্ধি করেছি কীভাবে একটা মানুষের জীবন একটা চার দেয়ালের মাঝে স্থির হয়ে যায়। কীভাবে সেকেন্ডের কাটা মিনিটে রুপান্তরিত হয় আর মিনিটের কাটা ঘন্টায়। কীভাবে একটা সামান্য দেয়াল মানুষকে তার এতদিনের ভোগ করা স্বাধীনতার মূল্য অনুধাবন করায়। রিক্সার টুংটাং আওয়াজ আর বাদামওয়ালার “বাদাম বাদাম” হাকেও যে এতটা মধু আছে তা জেলখানার এই উঁচু দেয়ালই আমাকে প্রথম অনুভব করিয়েছে।

জীবনে বহুবার আমার পাশ দিয়ে প্রিজন ভ্যানকে যেতে দেখেছি এবং ভ্যানের ছোট জানালা দিয়ে উৎসুক চোখগুলো দেখে তাদের জন্য ইনসাফের দোয়া করেছি। কিন্তু আমি নিজে যখন ঐ ভ্যানের সাওয়ারি হয়েছি এবং নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয় এই রকম ঠাসাঠাসি ভিড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আটকে থেকেছি, মাঘ মাসের শৈতপ্রবাহের শীতেও দরদর করে ঘেমে শরীরের পোশাক চুবচুবা করে ভিজিয়েছি তখন সত্যিকারভাবে বুঝতে পেরেছি ‘মানবাধিকার’ একটি কাল্পনিক শব্দ মাত্র। একে শুধু অভিধান আর নেতানেত্রীদের ভাষণেই পাওয়া যায়। বাস্তবে এর কোনই অস্তিত্ব নেই। ভেবে বিস্মিত হয়েছি কেন আমাদের দেশে ২০ জনের ধারন ক্ষমতাসম্পন্ন প্রিজন ভ্যানে ৫০ জনকে ঠেশে ঢুকানো হয় আর আমাদের তথাকথিত মানবধিকার কর্মীরা তা দেখেও না দেখার ভান করেন।
জেল কাউকে একদম ভেঙ্গে ফেলে আবার কাউকে আরো মজুবুত করে গড়ে তোলে। আলহামদুলিল্লাহ্, জেল আমাকে ভাঙতে পারেনি বরং নতুন এক উদ্দম দান করেছে। এই জেলখানাই আমাকে সাইয়্যেদিনা ইউসুফ আলাইহি ওয়াসাল্লামের বন্দীদশার অনুভূতি শিক্ষা দিয়েছে যা কোন কিতাব আমাকে কখনই দিতে পারেনি। এই জেলই আমাকে আমার বোন আফিয়া সিদ্দিকার কষ্ট যতটা হৃদয়ঙ্গম করিয়েছে তা কোন মিডিয়া কখনো পারে নি।
দীর্ঘ প্রায় এক বছর অন্যায়ভাবে কারাবন্দী জীবন কাটিয়েছি। মানুষ হিসেবে যখনই কিছুটা কষ্ট হয়েছে তখনই ইউসুফ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আফিয়া সিদ্দিকার ঘটনা আমাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে নতুন শক্তি দিয়েছে। আমার সেলের একদিকের দেয়ালে বড় করে লিখে রেখেছিলাম,
These are the best days of my life
মানুষ অবাক হতো। কিন্তু আমাকে দেখে আমার লেখা বিশ্বাসও করতো। শুধু এই লেখাটা দেখার জন্যই অনেকে আমাদের তালিমের হালাকায় ভিড় জমাতো আর অদ্ভুত এক স্বপ্নদৃষ্টি নিয়ে লেখাটার দিকে তাকিয়ে থাকতো।
প্রায় প্রতিটা দিন আমি মুক্ত আকাশে ভেসে বেড়ানো পাখিদের দিকে তাকিয়ে তাদের প্রতি ঈর্ষা প্রকাশ করেছি আর গুনগুন করে তিলাওয়াত করেছি
أَوَلَمْ يَرَ‌وْا إِلَى الطَّيْرِ‌ فَوْقَهُمْ صَافَّاتٍ وَيَقْبِضْنَ ۚ مَا يُمْسِكُهُنَّ إِلَّا الرَّ‌حْمَـٰنُ ۚ إِنَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ بَصِيرٌ‌
অর্থাৎ, তারা কি লক্ষ্য করে না, তাদের মাথার উপর উড়ন্ত পক্ষীকুলের প্রতি – পাখা বিস্তারকারী ও পাখা সংকোচনকারী? রহমান আল্লাহ-ই তাদেরকে স্থির রাখেন। তিনি সর্ব-বিষয় দেখেন। (সুরা মুলক : ১৯)
জেলের পুরো সময়টাই আমি দুটি পাখার ঘোরে আচ্ছন্ন ছিলাম। বার বার আল্লাহতাআ’লার কাছে দোয়া করেছি যেন তিনি আমাকে তার দুশমনের শৃংখল থেকে নিরাপদ রাখেন কিন্তু তাদের বুলেট থেকে বঞ্চিত না করেন। এই দুনিয়াতে যেমন আছি ভালোই আছি কিন্তু জান্নাতে যেন তিনি দয়া করে আমাকে দুটি মস্তবড় পাখা দান করেন। আমি এই বেহায়া পাখিগুলোর ওপর কিছুটা প্রতিশোধ নিতে চাই।
আমি অনেক ভাইদের দেখেছি জেলের ভয়ে জড়সড়। এরা দুনিয়ার সামান্য আরাম আয়েশ হারানোর ভয়ে আর জেল হাজত এড়ানোর জন্য জেনে বুঝে আল্লাহ্‌ প্রদত্ত হক থেকে চোখ লুকিয়ে বেড়ায়। কেউ কেউ এমনকি আল্লাহর হুকুম লুকাতে মিথ্যার আশ্রয় নিতে পর্যন্ত কিছু মাত্র দ্বিধা করছে না। ভাই একটু চোখ খুলে দেখুন। যে কারাগারকে আপনি এত ভয় পাচ্ছেন তা আসলে কিছুই না। প্রকৃত ভয়ের জায়গা হচ্ছে কবর যা এড়ানোর কোন বেবস্থাই হয়ত আপনি নিচ্ছেন না। 
জেল থেকে বেরুবার পর আমি যতবারই কবরস্থানের পাশ দিয়ে গিয়েছি ততবারই কবরের দিকে তাকিয়ে বলেছি, “হায় কবর! হায় কবর! নিশ্চয়ই তুমি অতি কঠিন ঠিকানা। বন্দীত্বের পূর্বে যেমন স্বাধীনতা কি জিনিস আমি বুঝি নি, মৃত্যুর পূর্বেও তেমনি হায়াতের মর্মও বুঝতে পারছি না। কারাগারের ভয় আমার নেই কিন্তু কবরে যাবার ইচ্ছাও আমার নেই।”
ইয়া আল্লাহ্! ইয়া মাবুদ! আমি মৃত্যু চাই না, হায়াত চাই। কবর চাই না সবুজ পাখির সিনা চাই। এক জোড়া পাখা চাই। আপনার রেদা চাই আর দ্বিদার চাই। ইয়া আল্লাহ্ আমি সত্যিকারের রেজাউল কাবির হতে চাই। বান্দা রেজা হতে চাই। আপনি আমাকে মৃত্যু থেকে হেফাজত করুন। কবর থেকে দূরে রাখুন। একটা বুলেট আমার জন্য মঞ্জুর করুন যা আমার সিনাকে ভেদ করে যাবে। আমাকে শাহাদাত দান করুন। আমাকে কবুল করুন।
আমিন ইয়া রব্বুল আলামিন।
source: ওয়াসসালাম
বান্দা রেজা

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন